#অজানা_সুখ
পর্বঃ ৪ ও শেষ
কলমেঃ আয়েশা সিদ্দিকা (লাকী)
আমাকে টেবিলে এক পাশে গিয়ে দাঁড়াতে দেখে মা বললো,
- কি গো তুমি ওখানে দাঁড়িয়ে কেনো নাস্তা করবেনা? অনেক বেলা হয়ে গেছে বসো জলদি। তাড়াতাড়ি নাস্তা করে নাও।
- মা, আপনারা খেয়ে উঠুন তারপর আমি খাচ্ছি।
- কেনো ভাবি? আমাদের সাথে কি খেতে তোমার লজ্জা করছে? আমরা তো বাড়িরই সবাই তাহলে লজ্জা কেনো করবে আসো বসো।
- না ঊষা তেমন কিছু না। তোমরা খেয়ে নাও তারপর আমি খাচ্ছি।
মা টেবিল থেকে উঠে এসে আমার কাছে দাঁড়িয়ে বললেন,
- কি হয়েছে ঋতু? কেও কি কিছু বলেছে তোমাকে?
- না মা কি যে বলেন আমাকে কেও কিছু বলেনি।
- তাহলে সবার সাথে খেতে কেনো বসছোনা?
আমি মাথাটা নিচু করে বললাম,
- মা, ছোটো বেলা থেকে দেখে এসেছি যে সবার খাওয়া শেষ হলে তবেই বাড়ির বউরা খায় তাই আপনারা খেয়ে নিন পরে আমি খাচ্ছি।
মা কোনো কথা বলে রাগে চোখ দুটো লাল করে আমার দিকে তাকিয়ে আমাকে টানতে টানতে টেবিলে নিয়ে বসিয়ে বললেন,
- ঋতু তোমাকে তো কাল রাতেই বলেছি, বাড়ির বউ হিসাবে যে নিয়মের দিন গুলো আমি বা আমরা পার করে এসেছি সে নিয়মের সামনা সামনি যেনো আমার বাড়ির বউ না হয়। তারপরও এমন চিন্তা তুমি মাথায় আনলে কি করে? কি হলো মাথা নিচু করে বসে আছো কেনো? নাও খেতে শুরু করো।
এ কথা বলে কয়েকটা রুটি আর তরকারি তুলে দিলেন আমার প্লেটে। আমি অবাক হয়ে শুধু ওই মায়াবীনির মুখের দিকে তাকিয়ে আছি। ননদ এর ধাক্কায় চেতনা ফিরলো।
- কি ভাবি এতো গভীর হয়ে কি ভাবছো? মা যাই হোক না কেনো আমি কিন্তু তোমার রায় বাঘিনী ননদীনি। নাও এবার খেয়ে নাও।
ঊষা কথা গুলো বলেই হেসে উঠলো। আমিও আর কোনো কথা না বলে খেতে শুরু করলাম। খাওয়া দাওয়া শেষ করে রুমে এসে দেখি সুমন রেডি হচ্ছে। আমাকে দেখে বললো,
- তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নাও।
- রেডি হবো কেনো? কোথায় যাচ্ছি আমরা?
- মা বললো তোমাকে তোমাদের বাড়ি থেকে ঘুরিয়ে আনতে।
- না আমি আজকে যাবোনা। আর কাল তো এমনিতেই যাচ্ছি তাই আজ আর যাবোনা।
- কিন্তু মা তো আমাকে বকাবকি করবে! তার চেয়ে এটাই ভালো তুমি রেডি হয়ে নাও চট জলদি। তোমার বাবা মায়ের সাথে দেখাও হবে আর আমাদেরও একান্তে কিছুটা সময় কাটানো হবে।
আমি আর কথা না বাড়িয়ে রেডি হতে গেলাম। রেডি হয়ে মায়ের রুমে গেলাম আমি আর সুমন,
- মা, আমি ঋতুকে নিয়ে একটু বাইরে গেলাম। আগে ওদের বাড়ি যাবো তারপর একটু ঘুরে চলে আসবো।
মা বিছানা ছেড়ে উঠে এসে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে সুমনকে বললো,
- সাবধানে যাস। বাইক সাবধানে চালাস।
- আচ্ছা মা।
- মা আসি!
- আচ্ছা মা এসো।
আমরা বেরিয়ে আগে মায়ের ওখানে গেলাম। মা তো আমাকে দেখে আকাশ থেকে পড়ার মতো অবস্থা। মা আমাকে জড়িয়ে ধরে কিছুক্ষণ কান্না করে তারপর আমাদের বসতে দিয়ে খাওয়া দাওয়ার ব্যাবস্থা করতে গেলো। দুপুরে খাওয়া দাওয়া শেষ করে সুমন কে বললাম,
- তুমি রেস্ট নাও, আর আমি আসার পর তো মায়ের সাথে সেভাবে কথা হয়নি রান্না বান্নায় ব্যাস্ত হয়ে গিয়েছিলো। আমি একটু মায়ের সাথে গিয়ে গল্প করে আসি?
- আরে এটা আমার কাছ থেকে অনুমতি চাওয়ার কি আছে! যাও তুমি মায়ের কাছে যাও আমি এই ফাঁকে একটু ঘুমিয়ে নেই।
- আচ্ছা।
আমি মায়ের পাশে বসতেই মা বললো,
- কিরে, তোরা এভাবে আজকে আসলি তোর শাশুড়ী কিছু বললোনা? আর তুই জামাইকেই বা কি করে বললি যে আজ এখানে আসবি?
- মা, আমার শাশুড়ী আমাকে কিছুই বলেনি আর সুমনকেও আমাকে কিছু বলা লাগেনি। কাল রাতেই শাশুড়ী মা সুমনকে বলে দিয়েছিলো আজ যেনো আমাকে এনে ঘুরিয়ে নিয়ে যায় তাই এখানে আসা। আর জানো মা ওই বাড়ির সবাই যে কতটা ভালো তুমি কল্পনাও করতে পারবানা। ওই বাড়িতে এবাড়ির মতো বউদের উপর কোনো আলাদা আলাদা নিয়ম চালু নেই মা। আমার ননদ, আমার শাশুড়ী, স্বামী সবাই আমাকে এই একদিনে কতটা আপন করে নিয়েছে তা তুমি ভাবতেও পারবেনা। জানো মা! ও বাড়িতে আমি সকালে সবার সাথে বসে নাস্তা করেছি। এ বাড়ির মতো কোনো নিয়ম নেই যে বাড়ির বউরা সবার খাওয়া শেষে খাবে।
কথা গুলো বলতে বলতে খেয়াল করলাম মায়ের চোখে পানি। মা হতভম্ব হয়ে আমার কথাগুলো শুনছে। মাকে একটু ধাক্কা দিয়ে বললাম,
- ও মা তুমি কাঁদছো কেনো?
- আমি কখনো ভাবিনি আমার মেয়ের কপালে সুখ লেখা ছিলো। আমার মেয়ে তার শশুর বাড়িতে এতো সম্মান নিয়ে থাকবে।
কথা গুলো বলেই মা আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলো। কিছুক্ষণ কান্না করার পর বললাম,
- আর কেঁদোনা মা, তুমি শুধু দোয়া করো তাদের এই ভালোবাসার মূল্য যেনো আমি দিতে পারি।
মা মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললো,
- দোয়া করি মা, এভাবেই সারাজীবন সবাইকে নিয়ে সুখে থাক।
মায়ের সাথে অনেক্ষণ বসে গল্প করলাম। বাইরের তাকিয়ে দেখি প্রায় সন্ধ্যে হয়ে গেছে। রুমে গিয়ে সুমনকে উঠালাম, তারপর দুজন রেডি হয়ে শশুর বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।
কিছুক্ষণ ঘুরাঘুরি করে বাড়ির সামনে এসে সুমন আমাকে বাইক থেকে নামিয়ে দিয়ে বললো তার নাকি কি একটা কাজ আছে এটা বলেই আবার বেরিয়ে গেলো।
রাতের খাওয়া দাওয়া শেষ করে আমি শাশুড়ী মা আর ঊষা সোফায় বসে গল্প করছিলাম আর টিভি দেখছিলাম। কলিং বেল বাজতেই মা উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিলো।
- কিরে সুমন ঋতুকে নামিয়ে দিয়ে কোথায় গিয়েছিলি?
- একটু কাজ ছিলো মা।
- কাজ শেষ হলো?
- হ্যাঁ মা শেষ হলো। মা আমি উপরে যাই? আবার এক্ষুনি আসছি।
খেয়াল করলাম সুমন কেনো জানি মায়ের কাছ থেকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পালাতে চাইছে। কিন্তু কেনো? আর সুমনের পিছনে হাত দিয়ে কিইবা লুকিয়ে রেখেছে।
- কিরে সুমন তোর পিছনে হাতে কি?
- কই মা কিছু না।
- কই হাত বের কর দেখি!
- আরে মা কি শুরু করলে কিছু নাই তো।
মা সুমনের হাতটা টেনে সামনে আনতেই দেখলাম ওর হাতে কিছু বেলি ফুল আর সাথে কয়েকটা গোলাপ। সুমন লজ্জায় মাথা নিচু করে আছে। আর মা মিটমিটিয়ে হাসছে। হঠাৎ মা কঠিন স্বরে বলে উঠলো,
- তোর এতো বড়ো সাহস যে তুই আমার সামনে দিয়ে লুকিয়ে বউ এর জন্য ফুল নিয়ে যাচ্ছিস!
মায়ের এমন কন্ঠস্বর শুনে আমি সোফা থেকে ধুচমুচিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে গেলাম। আমার মনে পড়ে গেলো সেদিনের কথা যেদিন বাবা মায়ের জন্য গাঁদা ফুল এনে মায়ের চুলে গুঁজে দিয়েছিলো। তাহলে কি.... আর কিছু ভাবতে পারলামনা কান্না চলে এলো।
- বউ এর জন্য ফুল আনবি ভালো কথা কিন্তু মাকে এভাবে লুকিয়ে আনতে হবে কেনো? ঋতু তোর বউ, তোর অর্ধাঙ্গিনী, তার এমন কিছু ছোটো ছোটো ভালোলাগা মন্দ লাগা গুলো একটু খেয়াল রাখবি। আর এভাবে মাঝে মধ্যে মাথায় একটা করে ফুল গুঁজে দিবি। দেখবি জীবনটা কত সুন্দর। একটা মেয়ের জীবন স্বামী সন্তান নিয়ে সুখে থাকতে খুব বেশি কিছু লাগেনারে। যা উপরে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আয় আমি খাবার বাড়ছি।
কথাগুলো শুনে মাথা তুলে তাকিয়ে দেখি মা সুমনের মাথায় হাত বুলাচ্ছে আর কথা গুলো বলছে।
- ঋতু, মা যাও। সুমন এসেছে উপরে যাও। ওকে সাথে করে এসে খেয়ে নাও। আমি ততক্ষণে সব রেডি করি।
আমি মাথা নাড়িয়ে সুমনের সাথে রুমে গেলাম। সুমন ফুল গুলো হাতে দিয়ে, একটা ফুল মাথায় গুজতে গুজতে বললো,
- তোমার প্রিয় গোলাপ, সাথে আমার বেলি ফুল। পছন্দ হয়েছে?
- খুব।
- তাই!!
- হুম। চলো মা খেতে যেতে বলেছে।
- একটু ওয়েট করো ফ্রেশ হয়ে আসি।
সুমন আর আমি নিচে গিয়ে রাতে খাবার খেতে বসলাম। খাওয়া শেষে মায়ের সাথে বসে কিছুক্ষণ গল্প করে এসে শুয়ে পড়লাম। পরদিন ঘরোয়া ভাবে ছোটো খাটো একটা আয়োজন করে আমাদের বাড়ি থেকে কিছু লোক এসে আমাকে নিয়ে গেলে। বাবার বাড়ি আট দিন থেকে আমি আর সুমন বাড়ি ফিরে এলাম। আজকেও সুমন আমাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে বললো কিছু কাজ আছে সেরে তারপর আসছি।
সুমন এর আসতে দেরি দেখে আমি মা, ঊষা খেয়ে নিলাম। আর সুমন এর জন্য খাবার বেড়ে রুমে নিয়ে আসলাম। আজ বাইরে সুন্দর পূর্ণিমা তাই বসে বসে চাঁদের আলো দেখছিলাম। এমন সময় সুমন পিছন থেকক মাথায় গোলাপ গুঁজে দিতে দিতে বললো,
- আজ পূর্নিমা, এই পূর্নিমা রাতের মতই সারাজীবন যেনো তোমার আমার এবং আমাদের সংসার আলোয় আলোয় ভরে থাকে। কখনো যেনো অন্ধকার নেমে না আসে আমাদের সংসারে।
- আসবেনা আমি কখনো আসতে দেবোনা। তোমাদের কাছ থেকে আমি যে অজানা সুখ পেয়েছি তা আমি আমার সর্বস্ব দিয়ে আগলে রাখবো সুমন। শুধু তুমি আর মা আমাকে দোয়া করো। তোমাদের কাছ থেকে পাওয়া আমার জীবনে এ যেন এক #অজানা_সুখ।
সমাপ্ত
(গল্পটা পড়ে কেমন লাগলো অবশ্যই জানাবেন। যদি ভুল ত্রুটি হয়ে থাকে লেখার মাঝে সেটাও কমেন্টে জানাবেন।)
.jpeg)